দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ উদ্যোগে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে পড়বে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করার সিদ্ধান্তে সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ আকস্মিকভাবে শেষ হচ্ছে। প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি মিত্র দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মহড়ার নির্ধারিত কর্মসূচির অর্ধেক শেষ হওয়ার পরই তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
এর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প পেন্টাগনকে মহড়াটি ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে’ দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি মহড়াটিকে উত্তর কোরিয়ার জন্য ‘অনুপযুক্ত ও বৈরী’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল বলে মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত তাঁর মিত্রদেরও বিস্মিত করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন সিদ্ধান্তটিকে দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতার ফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও স্বীকার করেছেন, মহড়া কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের আগাম কোনো তথ্য দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের কাছে ছিল না।
এ সিদ্ধান্তে তাইওয়ান ও জাপানের মতো দেশগুলোও উদ্বিগ্ন হয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরশীল এসব দেশ।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবারও বৈঠক করতে চান। দক্ষিণ কোরিয়াও দীর্ঘদিন ধরে কূটনীতির মাধ্যমে ট্রাম্প-কিম যোগাযোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে এর বিনিময়ে সামরিক সহায়তা বা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার চাপ তারা চায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্ষিক সামরিক মহড়া দুই দেশের জোটের অন্যতম ভিত্তি এবং উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অতীতে উত্তর কোরিয়াকে আলোচনায় ফেরাতে মহড়া কমানো বা স্থগিত করতে সিউল রাজি হলেও এবার ট্রাম্পের আকস্মিক ও একতরফা সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার আস্থায় ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করেন আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক জো বি-ইউন।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। তাদের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়া বা উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করার দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি থেকে সরে আসার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
দুই কোরিয়া আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর না করায় কারিগরি অর্থে এখনো যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। যদিও উত্তর কোরিয়া ২০২৪ সালে দক্ষিণের সঙ্গে একীভূত হওয়ার নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে তাদের হুমকি বন্ধ হয়নি।
সামরিক মহড়ার কয়েক দিন আগেই উত্তর কোরিয়া জাপানমুখী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং হুমকি দেয়, দেশটির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে তারা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার রাখে। বৃহস্পতিবারও আরও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
তবে এবার দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, ট্রাম্প প্রশাসন নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক বিষয়কে আলাদা করে দেখছে না। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশ না নেওয়ায় ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য নিয়েও তাঁর প্রশাসনের বিরোধ রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়া দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করলেও তা যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও সিউল ধীরগতিতে এগোচ্ছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক বিরোধ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। সেজং ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট চিওং সিওং-চ্যাং মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বজায় রেখেও দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের বড় অংশ নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে থাকলেও দেশটির সরকার মনে করে, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন অপ্রয়োজনীয় এবং এতে দেশটির আন্তর্জাতিক জোটব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র আরও সরে গেলে এই অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং অবশ্য ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী লি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গভীর চিন্তাভাবনার ফল হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের নেওয়া উচিত—ট্রাম্পের এই অবস্থানের সঙ্গে তিনি পুরোপুরি একমত।
ট্রাম্পের কূটনীতির অনিশ্চিত ধরনকে সিউল তাঁর প্রথম মেয়াদ থেকেই ঝুঁকি ও সুযোগ—দুই হিসেবেই দেখেছে। প্রশংসা ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো দায়িত্বে থাকা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও উত্তর কোরীয় নেতার বৈঠকের আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে সেই বৈঠকের পরই ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিতের ঘোষণা দেন। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় বৈঠকে কিম তাঁর সব পরমাণু স্থাপনা ত্যাগে রাজি না হওয়ায় ট্রাম্প কোনো চুক্তি ছাড়াই বৈঠক ছেড়ে যান। একই বছর পানমুনজমে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হলেও এরপর দুই নেতার মধ্যে আর কোনো উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়নি।
ওই শীর্ষ বৈঠকগুলোর পর উত্তর কোরিয়ার ক্ষোভের বড় অংশ দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর গিয়ে পড়ে। উত্তর কোরিয়া তাদের ভূখণ্ডে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের কার্যালয় ধ্বংস করে এবং পরে দুই দেশের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি সংবিধানে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত করে দেশটি।
অন্যদিকে ট্রাম্প এখনো কিমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে ‘দারুণ’ বলে দাবি করছেন। বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কিম তাঁকে পছন্দ করেন।
তবে কিমের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং ট্রাম্পের এই দাবির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের সাম্প্রতিক যোগাযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করে এটিকে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তাঁর অজানা একমাত্র বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, উত্তর কোরিয়া কখনোই পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করবে না। তাঁর মতে, এসব অস্ত্র আঞ্চলিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বাড়ায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও কিম ইয়ো জং বলেন, বিষয়টি উত্তর কোরিয়ার আগ্রহ বা মন্তব্যের যোগ্য নয় এবং এতে মহড়ার ‘বৈরী ও আক্রমণাত্মক চরিত্র’ বদলাবে না।
ট্রাম্প বছরের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে বৈঠকের কথা বললেও বিশেষজ্ঞদের অনেকে এ ধরনের আরেকটি শীর্ষ বৈঠকের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ কিমকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।
উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে দেশটিকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন এ অবস্থান মেনে না নিলে কিমের নতুন আলোচনায় যাওয়ার বড় কোনো প্রণোদনা নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত পিয়ংইয়ংয়ের পাশাপাশি চীনের জন্যও বড় ধরনের ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়া সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সময়ে ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে আরও দাবির পথও খুলে যেতে পারে।
ট্রাম্প বারবার উত্তর কোরিয়াকে হুমকি নয় বলে দাবি করলেও দেশটি সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো বন্ধ করেনি। উত্তর কোরিয়া ছয়বার পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে এবং আন্তমহাদেশীয় পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে হামলার সক্ষমতাও অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটি রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি অন্তত ১৩ হাজার সেনা পাঠিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের হাজার হাজার হতাহত হলেও তারা ড্রোন ব্যবহারে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে একা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। জো বি-ইউনের মতে, এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার জোট তাদের জন্য কার্যত ‘জীবন-মরণের বিষয়’।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/